বিভিন্ন রঙিন ওষুধ

এন্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ না করলে কী হয়? জানুন কেন সতর্ক হওয়া জরুরি

তিন দিন ধরে গলাব্যথা আর জ্বরে ভুগছেন। ডাক্তার দেখালেন, পাঁচ দিনের এন্টিবায়োটিক লিখে দিলেন। দুই দিন খাওয়ার পরেই জ্বর নেই, গলার ব্যথাও প্রায় উধাও। শরীর হালকা লাগছে, অফিসও বাকি পড়ে আছে। মনে মনে ভাবলেন, “এখন তো সুস্থই আছি, বাকি ওষুধ আর খেয়ে কী হবে? থাক, পরে কাজে লাগবে।” ওষুধের পাতাটা ড্রয়ারে রেখে দিলেন।

দৃশ্যটা কি চেনা চেনা লাগছে? আমাদের দেশে ঘরে ঘরে এমন গল্প আছে। কেউ খরচ বাঁচাতে ওষুধ বন্ধ করেন, কেউ ভুলে যান, কেউ বা “অনেক কড়া ওষুধ” ভেবে ভয় পান। আসলে এই ছোট্ট সিদ্ধান্তটার প্রভাব শুধু আপনার একার শরীরে থামে না। এটি পরিবার, পাড়া, এমনকি হাসপাতাল পর্যন্ত গড়াতে পারে।

বিভিন্ন ধরণের ওষুধের খাওয়া স্ট্র্যাপ

এন্টিবায়োটিক আসলে কী?

এন্টিবায়োটিক এমন একধরনের ওষুধ, যা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে বা তাদের বংশবৃদ্ধি আটকে দেয়। নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ, টাইফয়েড, কিছু ধরনের গলার ও চামড়ার সংক্রমণের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে এটি জীবনরক্ষাকারী। মনে রাখতে হবে, এন্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। সাধারণ সর্দি-কাশি বা বেশিরভাগ ভাইরাল জ্বরে এটি অপ্রয়োজনীয়।

মূল সমস্যা কোথায়?

“একটু ভালো লাগলেই ওষুধ বন্ধ” অভ্যাসটা ক্ষতিকর, কারণ ভালো লাগা মানেই সব জীবাণু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় দেখব, মাঝপথে ওষুধ ছাড়লে শরীরে কী ঘটতে পারে। আরও দেখব, এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কেন বিশ্বজুড়ে আতঙ্কের নাম, আর আমরা প্রত্যেকে কী করতে পারি।


এন্টিবায়োটিক কীভাবে কাজ করে?

ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সহজ ব্যাখ্যা

ব্যাকটেরিয়াকে একটি ছোট দুর্গ ভাবুন। কোনো এন্টিবায়োটিক দুর্গের দেয়াল ভেঙে দেয়। কোনোটি দুর্গের ভেতরের কারখানা বন্ধ করে দেয়, যেখানে নতুন প্রোটিন বা বংশবৃদ্ধির উপাদান তৈরি হয়। ফলে ব্যাকটেরিয়া হয় মারা যায়, নয়তো বাড়তে পারে না। বাকি কাজটা সারে আমাদের শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

তবে একটা কথা পরিষ্কার থাকা দরকার। এন্টিবায়োটিক রাতারাতি সব জীবাণু সাফ করে দেয় না। এটি ধীরে ধীরে সংখ্যা কমায়, আর দেহের প্রতিরক্ষা বাহিনী বাকি অংশ সামলায়।

কোর্স কেন নির্দিষ্ট দিনের হয়?

ডাক্তার ৩, ৫, ৭ বা ১০ দিনের কোর্স দেন কেন? এর পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করে:

  • সংক্রমণের ধরন: গলার সংক্রমণ আর হাড়ের সংক্রমণের চিকিৎসার সময় এক নয়।
  • সংক্রমণের জায়গা: ওষুধ সব অঙ্গে সমান পরিমাণে পৌঁছায় না।
  • ওষুধের ধরন ও মাত্রা: প্রতিটি এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা আলাদা।
  • রোগীর অবস্থা: বয়স, ডায়াবেটিস, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, কিডনির অবস্থা ইত্যাদি।

যক্ষ্মার মতো রোগে তো চিকিৎসা চলে কয়েক মাস। অর্থাৎ কোর্সের দৈর্ঘ্য কোনো আন্দাজ নয়। এটি গবেষণা আর ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে ঠিক করা হয়।


মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করলে আসলে কী ঘটে?

সব জীবাণু একসঙ্গে মরে না

একই সংক্রমণের ভেতরে লক্ষ লক্ষ ব্যাকটেরিয়া থাকে, আর সবাই সমান নয়। কিছু ব্যাকটেরিয়া ওষুধে খুব দ্রুত কাবু হয়। কিছু একটু সময় নেয়। কিছু আবার স্বভাবগতভাবেই বেশি টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে। প্রথম এক-দুই দিনে ওষুধ সংখ্যার বেশিরভাগ কমিয়ে দেয়, তাই জ্বর-ব্যথা কমে যায়। কিন্তু বাকি অংশটা তখনও শরীরে থেকে যেতে পারে।

“দ্বিগুণ শক্তি” কথাটা আসলে কতটা সত্য?

আমরা প্রায়ই শুনি, বেঁচে যাওয়া ব্যাকটেরিয়া নাকি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। বিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাপারটা এভাবে দেখা যায়: ব্যাকটেরিয়া হঠাৎ “শক্তি অর্জন” করে না। সংখ্যায় লক্ষ লক্ষ ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে কয়েকটির জিনে আগে থেকেই এমন সামান্য পরিবর্তন (মিউটেশন) থাকতে পারে, যা ওষুধের প্রভাব কিছুটা কমায়। ওষুধ দুর্বলদের সরিয়ে দিলে এই কম-সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়াগুলোই টিকে থাকে এবং বংশবৃদ্ধি করে। একে বলা হয় প্রাকৃতিক নির্বাচন (selection pressure)। ব্যাকটেরিয়া আবার জিনের টুকরো একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগিও করতে পারে। এভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ে।

একটি ঐতিহাসিক সতর্কবাণী: ফ্লেমিংয়ের ১৯৪৫ সালের ভাষণ

পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য ১৯৪৫ সালে অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং, হাওয়ার্ড ফ্লোরি ও আর্নস্ট চেইন যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান। সেই নোবেল বক্তৃতার শেষে ফ্লেমিং নিজেই একটি সতর্কবাণী দেন। তিনি বলেছিলেন, এমন সময় আসতে পারে যখন পেনিসিলিন দোকানে যে কেউ কিনতে পারবে। তখন অজ্ঞ কোনো মানুষ ভুল করে কম মাত্রায় ওষুধ খেয়ে ফেলতে পারে। জীবাণুগুলো মারাত্মক মাত্রার ওষুধের সংস্পর্শে না এসে ধীরে ধীরে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। ফ্লেমিংয়ের ওই আশঙ্কা যে কতটা সত্যি হয়েছে, তা নিয়ে পরে আমরা কথা বলব। (সূত্র: NIHR Oxford Biomedical Research Centre ও যুক্তরাজ্যের National Archives, নিচে লিংক দেওয়া আছে)

পেনিসিলিন এর জনক আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ((১৯৮১-১৯৫৫)

একটি সত্য ঘটনা: পেনিসিলিনের প্রথম দিকের এক রোগী

পেনিসিলিনের প্রথম দিকের চিকিৎসার একটি কাহিনি ইতিহাসে নথিভুক্ত আছে। ১৯৪১ সালে অক্সফোর্ডে অ্যালবার্ট আলেকজান্ডার নামে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে পেনিসিলিন দেওয়া হয়। পাঁচ দিনের ইনজেকশনে তাঁর সংক্রমণ সারতে শুরু করে। কিন্তু তখন পেনিসিলিন এতই দুষ্প্রাপ্য ছিল যে কোর্স শেষ করার মতো পরিশোধিত ওষুধ ছিল না। অবস্থার উন্নতি উল্টে যায়, তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং প্রায় এক মাস পর মারা যান। (সূত্র: REACT Group ও BMJ-তে প্রকাশিত বিশ্লেষণ)

এখানে একটি কথা সততার সঙ্গে বলা দরকার। তাঁর ক্ষেত্রে ওষুধ ফুরিয়ে গিয়েছিল, তিনি নিজে থেকে বন্ধ করেননি। তবুও ঘটনাটি দেখায়, সংক্রমণ অর্ধেক দমন করে ছেড়ে দিলে সেটি আবার ফিরে আসতে পারে।


উপসর্গ কমে যাওয়া মানেই কি রোগমুক্তি?

“জ্বর তো নেই, ওষুধ কেন খাব?”

এই প্রশ্নটি আমাদের সমাজে খুবই সাধারণ। উত্তরটা সহজ। জ্বর, ব্যথা বা কাশি হলো শরীরের প্রতিক্রিয়া। জীবাণুর সংখ্যা কমে এলে প্রতিক্রিয়াও কমে যায়। কিন্তু উপসর্গ না থাকা আর জীবাণু একেবারে না থাকা আলাদা বিষয়।

পার্থক্যটা এক নজরে

বিষয়উপসর্গ কমে যাওয়াজীবাণু সম্পূর্ণ নির্মূল
আপনি কীভাবে বুঝবেনজ্বর, ব্যথা, কাশি কমে যায়সহজে বোঝা যায় না, অনেক সময় পরীক্ষা লাগে
সময়সাধারণত প্রথম এক-দুই দিনেআরও বেশি সময় লাগতে পারে
ঝুঁকিওষুধ ছাড়লে উপসর্গ আবার ফিরতে পারেঅবশিষ্ট জীবাণু থেকে রোগ ফিরে আসতে পারে
সিদ্ধান্ত কে নেবেরোগী নিজে অনুভব করেনডাক্তার রোগ ও ওষুধ দেখে ঠিক করেন

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক: আধুনিক গবেষণা কী বলছে?

এখানে একটি সত্য আপনার জানা দরকার, কারণ এই লেখাটি আপনাকে অর্ধসত্য জানাতে চায় না। ২০১৭ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (BMJ)-এ মার্টিন ল্লেউলিন ও তাঁর সহকর্মীদের একটি বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়। শিরোনাম “The antibiotic course has had its day”। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আগে ওষুধ ছাড়লে রেজিস্ট্যান্স বাড়ে, এর শক্ত প্রমাণ নেই। বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় ওষুধ খেলে রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ে বলে তাঁরা মনে করেন।

কিন্তু এই প্রস্তাবের সমালোচনাও হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, তখনই কোর্স ছোট করার সুপারিশ করা তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে। আরও গবেষণা দরকার। তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা কী দাঁড়াল?

  • ডাক্তার এখন অনেক ক্ষেত্রে আগের চেয়ে ছোট কোর্স দিচ্ছেন। তাঁদের নির্ধারিত কোর্সই আপনার জন্য সঠিক।
  • নিজের মতো কোর্স ছোট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়।
  • ভালো লাগছে বলে ওষুধ বন্ধ করার আগে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন। প্রয়োজনে ডাক্তারই বলে দিতে পারেন আগে বন্ধ করা যাবে কি না।

সহজ কথায়: “কোর্স শেষ করুন” মানে ডাক্তারের দেওয়া নির্দেশ মেনে চলুন। আর সবচেয়ে বড় কথা, প্রথমেই অকারণে এন্টিবায়োটিক নেবেন না।


এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কী এবং এটি কেন বিপজ্জনক?

সুপারবাগ কীভাবে তৈরি হয়?

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হলো এমন অবস্থা, যখন কোনো ব্যাকটেরিয়া ওষুধের প্রভাবে আর মরে না বা বাড়া থামে না। একই ব্যাকটেরিয়া যখন একাধিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ ভাষায় তাকে “সুপারবাগ” বলা হয়।

প্রতিবার আমরা এন্টিবায়োটিক খেলে ব্যাকটেরিয়ার ওপর একধরনের চাপ তৈরি হয়। যে ব্যাকটেরিয়া এই চাপ সামলাতে পারে, সে টিকে যায়। যত বেশি অপ্রয়োজনীয়, ভুল মাত্রার বা ভুল সময়ের ব্যবহার, তত বেশি প্রতিরোধীদের টিকে যাওয়ার সুযোগ। BMJ বিশ্লেষণেও বলা আছে, এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও রেজিস্ট্যান্সের সম্পর্ক স্পষ্ট। অর্থাৎ ব্যবহার কমানো মানেই সুরক্ষা বাড়ানো।

পরিসংখ্যান কী বলছে?

২০২৪ সালে The Lancet-এ প্রকাশিত Global Burden of Disease (GBD) গবেষণায় বিশ্বজুড়ে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সংক্ষেপে:

তথ্যসংখ্যা
২০২১ সালে ব্যাকটেরিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুআনুমানিক ৪৭ লাখ ১০ হাজার
সরাসরি রেজিস্ট্যান্সের কারণে মৃত্যুআনুমানিক ১১ লাখ ৪০ হাজার
২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য মৃত্যু (প্রক্ষেপণ)প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ
১৯৯০ থেকে ২০২১: ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মৃত্যুর হার৮০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি

(সূত্র: IHME ও HealthDay-র সারসংক্ষেপ, লিংক নিচে)

একই গবেষণায় ২০৫০ সালের জন্য আরেকটি পূর্বাভাসও আছে। বলা হয়েছে, সরাসরি রেজিস্ট্যান্সের কারণে বছরে প্রায় ১৯ লাখ ১০ হাজার এবং রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ৮২ লাখ ২০ হাজার মৃত্যু হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকায় এই হার সবচেয়ে বেশি থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ। তাই এই সংখ্যাগুলো আমাদের জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।

ফ্লেমিংয়ের ভবিষ্যদ্বাণী কত দ্রুত ফলে গেল?

পেনিসিলিন সহজলভ্য হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার খবর আসতে শুরু করে। REACT Group-এর তথ্য অনুযায়ী, পেনিসিলিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রথম ঘটনা নথিভুক্ত হয় ১৯৪৭ সালে।

সালঘটনা
১৯২৮ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন
১৯৪১প্রথম দিকের এক রোগীর চিকিৎসা, ওষুধ ফুরিয়ে যাওয়ায় রোগ ফিরে আসে
১৯৪৫নোবেল পুরস্কার ও ফ্লেমিংয়ের সতর্কবাণী
১৯৪৭পেনিসিলিন রেজিস্ট্যান্সের প্রথম ঘটনা নথিভুক্ত
২০১৭BMJ-তে “কোর্সের ধারণা” নিয়ে বিতর্কিত বিশ্লেষণ
২০২৪The Lancet-এ বৈশ্বিক রেজিস্ট্যান্স বোঝা নিয়ে সর্বশেষ বিশ্লেষণ

অসম্পূর্ণ কোর্সের কারণে সম্ভাব্য শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি

এন্টিবায়োটিকের কোর্স মাঝপথে থামিয়ে দিলে ক্ষতিটা সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে না। বরং কয়েক দিন বা সপ্তাহ পরে, কখনও আরও বেশি জোর নিয়ে, সমস্যা ফিরে আসে। তখন অনেকে বুঝতেই পারেন না যে এর শুরুটা হয়েছিল সেই মাঝপথে ওষুধ ছাড়ার সিদ্ধান্ত থেকে। চলুন ঝুঁকিগুলো একে একে দেখি।

সর্দিতে আক্রান্ত ব্যক্তি

রোগ ফিরে আসা

আগেই বলা হয়েছে, উপসর্গ কমে যাওয়া মানে সব জীবাণু শেষ হওয়া নয়। ওষুধ কয়েক দিনেই জীবাণুর সংখ্যা অনেক কমিয়ে দেয়, তাই জ্বর, ব্যথা বা জ্বালাপোড়া কমে যায়। কিন্তু যে অল্প কিছু জীবাণু তখনও টিকে আছে, ওষুধের চাপ সরে গেলে তারা আবার বাড়তে শুরু করে। সংখ্যা যখন আবার বেশ বেড়ে যায়, তখন একই উপসর্গ ফিরে আসে।

এই ফিরে আসা কয়েকভাবে বোঝা যায়:

  • কোর্স ছাড়ার দুই-তিন দিন বা এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে আগের মতো জ্বর বা ব্যথা আবার শুরু হয়।
  • আগের চেয়ে বেশি তীব্র হতে পারে, যেমন জ্বর বেশি ওঠা বা ব্যথা বেড়ে যাওয়া।
  • ঘরোয়া উপায় বা সাধারণ ওষুধে আর সহজে কমে না।

মূত্রনালির সংক্রমণ এর একটি চেনা উদাহরণ। প্রস্রাবের জ্বালা কমে গেলে অনেকেই ওষুধ বন্ধ করে দেন। কিছুদিন পর আবার জ্বালা, ঘন ঘন প্রস্রাব বা তলপেটে ব্যথা ফিরে আসে। বারবার এমন হলে মানুষ “আমার তো এই সমস্যা লেগেই আছে” ভেবে নেন। অথচ কখনও কখনও কারণটা ছিল প্রথমবারের অসম্পূর্ণ চিকিৎসা।

আগের অংশে অ্যালবার্ট আলেকজান্ডারের ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রেও সংক্রমণ সারতে শুরু করেছিল, কিন্তু ওষুধ ফুরিয়ে যাওয়ায় চিকিৎসা অর্ধেক পথে থেমে যায় এবং রোগ ফিরে আসে। সেটি ছিল ওষুধের অভাব, আজকের দিনে আমাদের হাতে ওষুধ থাকে। তাই অভাব না থাকা সত্ত্বেও বন্ধ করে দেওয়া আরও দুঃখজনক।

রোগ জটিল হয়ে যাওয়া

সংক্রমণ পুরোপুরি না সারলে জীবাণু শরীরের এক অংশে সীমাবদ্ধ না থেকে আশপাশে বা গভীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কয়েকটি সম্ভাব্য পরিণতি:

প্রাথমিক সংক্রমণঅসম্পূর্ণ চিকিৎসায় যে জটিলতা দেখা দিতে পারে
গলা বা টনসিলের সংক্রমণকান, সাইনাস বা আশপাশের টিস্যুতে ছড়ানো
চামড়ার সংক্রমণ (ফোড়া, ক্ষত)গভীর টিস্যুতে প্রবেশ, ফোলা, পুঁজ জমা
মূত্রনালির সংক্রমণকিডনি পর্যন্ত পৌঁছানো, জ্বর ও কোমরব্যথা
ফুসফুসের সংক্রমণরোগ দীর্ঘায়িত হওয়া, শ্বাসকষ্ট বাড়া
যেকোনো গুরুতর সংক্রমণরক্তে ছড়িয়ে সেপসিস, যা জীবনঘাতী

সব ক্ষেত্রে যে এমন হবেই, তা নয়। কিন্তু ঝুঁকি আছে, আর সেটা সবচেয়ে বেশি থাকে শিশু, বয়স্ক, ডায়াবেটিসের রোগী এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে। এদের শরীর সংক্রমণকে নিজে থেকে সামলাতে কম সক্ষম, তাই ওষুধ আধাআধি ছেড়ে দিলে ক্ষতির সম্ভাবনাও বেশি।

সেপসিস হলো শরীরের এমন একটি অবস্থা, যেখানে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের নিজের প্রতিক্রিয়াই অঙ্গগুলোর ক্ষতি করতে শুরু করে। এর জন্য জরুরি চিকিৎসা লাগে। তাই এমন সংক্রমণ হেলাফেলা করার মতো বিষয় নয়।

পরের বার কড়া ওষুধ লাগার ঝুঁকি

আগের কোর্সের পর যদি টিকে থাকা জীবাণু ওষুধের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে যায়, তাহলে পরের বার সেই একই ওষুধ আগের মতো কাজ নাও করতে পারে। তখন ডাক্তারকে বাধ্য হয়ে অন্য, আরও উচ্চ ক্ষমতার (higher generation) এন্টিবায়োটিকের কথা ভাবতে হয়।

এসব ওষুধের কিছু সাধারণ অসুবিধা:

  • দাম বেশি: সাধারণ এন্টিবায়োটিকের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি খরচ।
  • ইনজেকশন বা স্যালাইনের মাধ্যমে দেওয়া: মুখে খাওয়ার বদলে হাসপাতালে ভর্তি থেকে দিতে হতে পারে।
  • পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা বেশি: কিডনি, লিভার বা অন্ত্রের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
  • বিকল্প কম: যত উচ্চ ক্ষমতার ওষুধ ব্যবহার হয়, ভবিষ্যতে হাতে থাকা বিকল্প তত কমে আসে।

শেষ কথাটি বিশেষভাবে খেয়াল করার মতো। ওষুধের তালিকা সীমিত। যেদিন উচ্চ ক্ষমতার ওষুধগুলোও আর কাজ করবে না, সেদিন চিকিৎসকের হাতে বিকল্প খুব কমই থাকবে। বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকরা এ নিয়েই উদ্বিগ্ন। ২০২৪ সালে The Lancet-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বাপেনেম শ্রেণির ওষুধের প্রতি রেজিস্ট্যান্স অন্য যেকোনো শ্রেণির চেয়ে বেশি বেড়েছে (সূত্র: HealthDay-র সারসংক্ষেপ, নিচের তথ্যসূত্রে লিংক দেওয়া আছে)। কার্বাপেনেম সাধারণত গুরুতর সংক্রমণের জন্য রাখা ওষুধ।

খরচ ও সময় বেড়ে যাওয়া

প্রথম কোর্স শেষ না করে কিছু টাকা বাঁচানো যায়, এমন মনে হতে পারে। কিন্তু রোগ ফিরে এলে পুরো হিসাবটা উল্টে যায়।

প্রথমবার কোর্স শেষ করলেঅসম্পূর্ণ রেখে রোগ ফিরে এলে
একবার ডাক্তার দেখানোআবার ডাক্তার, হয়তো একাধিকবার
নির্ধারিত ওষুধের খরচনতুন বা দামী ওষুধ, কখনও ইনজেকশন
প্রয়োজন না হলে কোনো পরীক্ষা নয়কালচার-সেনসিটিভিটির মতো পরীক্ষা লাগতে পারে
অল্প কয়েক দিনের অসুস্থতাসপ্তাহের পর সপ্তাহ ভোগান্তি
সাধারণত বাড়িতেই চিকিৎসাকখনও হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন
কাজে সামান্য ক্ষতিকাজ বা পড়াশোনা থেকে দীর্ঘ ছুটি

আমাদের দেশে অনেক পরিবারে একজন উপার্জনকারী অসুস্থ হলে পুরো সংসারের হিসাবে টান পড়ে। কখনও সন্তানের স্কুল বাদ যায়, কখনও দিনমজুরের একদিনের মজুরি। এসব অদৃশ্য খরচ যোগ করলে ছোট্ট একটি অসম্পূর্ণ কোর্সের দাম অনেক বেড়ে যায়।

একটি মানসিক ঝুঁকি যা আমরা ভুলে যাই

শেষ ঝুঁকিটা শরীরে নয়, মনে। যে রোগ একবার সেরে গেছে ভেবেছিলেন, সেটি ফিরে এলে হতাশা তৈরি হয়। “ওষুধ খেয়েও লাভ হয়নি” ভেবে অনেকে ডাক্তার ও ওষুধের ওপর আস্থা হারান, আর সেই সুযোগে হাতুড়ে চিকিৎসা বা নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ার দিকে ঝোঁকেন। অথচ আসল কারণ হয়তো ছিল চিকিৎসার ছেদ। এই চক্রটি ভাঙতে হলে সবার আগে দরকার প্রথম কোর্সটি ঠিকভাবে সম্পূর্ণ করা, আর যদি ছোট করার প্রশ্ন ওঠে, সেটি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে করা।


জনস্বাস্থ্যে এর মারাত্মক প্রভাব

প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া শুধু আপনার নয়

রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া শরীরে একা থাকে না। হাঁচি-কাশি, অপরিষ্কার হাত, দূষিত খাবার-পানি, হাসপাতালের সংস্পর্শ, এভাবে এরা পরিবার ও সমাজে ছড়াতে পারে। কারও শরীরে একবার প্রতিরোধী জীবাণু জন্মালে সেই জীবাণু অন্য মানুষকেও সংক্রমিত করতে পারে। ফলে সেই সংক্রমণ সারাতে সাধারণ ওষুধ আর কাজ করে না। শিশু, বয়স্ক ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশের জাতীয় ওষুধ নীতিতে বলা আছে, নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এর অনুসরণ দুর্বল, এমন কথা বিভিন্ন গবেষণায় এসেছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গুণগত গবেষণায় (গ্রামে ও শহরে ২০১৯-২০ সালে পরিচালিত) বলা হয়েছে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া পাওয়া এন্টিবায়োটিক ভুল সময়কাল বা ভুল মাত্রায় ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। (সূত্র: Journal of Pharmaceutical Policy and Practice, লিংক নিচে)

বিভিন্ন আকারের রঙিন ওষুধ

আরও দুটি প্রতিবেদনের তথ্য:

  • ২০১৯ সালে The Financial Express-এ প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগ ডিজিডিএ-র পক্ষে একটি গবেষণা চালায়, যেখানে সহায়তা করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গবেষণায় ঢাকা শহরে বিনা প্রেসক্রিপশনে সিপ্রোফ্লক্সাসিনের মতো এন্টিবায়োটিক পাওয়ার কথা উঠে আসে।
  • ২০২২ সালে একই পত্রিকার আরেকটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, ডিজিডিএ কর্মকর্তারা প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রিতে ২০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলেছেন। এছাড়া প্রস্তুতকারকদের প্যাকেটে লাল চিহ্নসহ “এন্টিবায়োটিক” লেখা এবং “নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ব্যবহার করবেন না” নির্দেশনা যোগ করতে বলা হয়েছিল।

আপনি যদি কোনো ওষুধের দোকানে এন্টিবায়োটিক কিনতে যান, প্রেসক্রিপশন না দেখে ওষুধ দিলে সেটি ঝুঁকির আগাম সংকেত।

পরিবারের মধ্যে একটি ছোট সিদ্ধান্ত, অনেক বড় প্রভাব

ধরুন, আপনার শিশুর জন্য লেখা ওষুধ সে ভালো হতেই আপনি বন্ধ করে দিলেন। আবার ওই শিশুর সঙ্গে ঘরে বাড়ির বাকিরা আছেন, বৃদ্ধ দাদা-দাদী, সদ্যোজাত ভাইবোন। যদি ওই ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে কম সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, তা ছড়াতে পারে সবার মধ্যে। তাই এন্টিবায়োটিক ব্যবহার একটি ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক দায়িত্বও।


এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা

যা করবেন ও যা করবেন না

✅ করণীয়❌ বর্জনীয়
ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এন্টিবায়োটিক নিননিজে নিজে ফার্মেসি থেকে কিনে খাওয়া
ডাক্তার যে সময়, যতবার ও যে মাত্রায় বলেছেন ঠিক সেভাবে খানভালো লাগলেই নিজে ওষুধ বন্ধ করা
কোনো ডোজ বাদ পড়লে ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টকে জিজ্ঞেস করুনপরের ডোজে ইচ্ছেমতো দ্বিগুণ খেয়ে নেওয়া
ওষুধের তারিখ ও প্যাকেটের নির্দেশনা দেখুনমেয়াদোত্তীর্ণ বা ভাঙা প্যাকেটের ওষুধ খাওয়া
ওষুধ কেন দিয়েছেন তা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুনসর্দি-কাশি বা ভাইরাল জ্বরে নিজে থেকে এন্টিবায়োটিক চাওয়া
পুরো কোর্সের জন্য যতটুকু প্রয়োজন কিনুনপরে কাজে লাগবে ভেবে অবশিষ্ট ওষুধ জমিয়ে রাখা

পুরনো বা অন্যের ওষুধ কেন নয়?

“আমার ভাইয়ের গলাব্যথায় এই ওষুধটা কাজ করেছিল, আমিও খাই” এই ভাবনা বিপজ্জনক। একই লক্ষণ আলাদা ব্যাকটেরিয়ার কারণে হতে পারে। কখনও ভাইরাসের কারণেও হতে পারে। অন্যের ওষুধ আপনার ওজন, বয়স, কিডনি-লিভারের অবস্থা বা অ্যালার্জির সঙ্গে নাও মিলতে পারে। আর কম মাত্রায় ওষুধ খেলে সেই “underdose” ব্যাপারটাই ঘটে, যা নিয়ে ফ্লেমিং সতর্ক করেছিলেন।

হাতের ছোঁয়ায় কয়েকটি ছোট অভ্যাস

  • ফোনে অ্যালার্ম দিন: সকাল, দুপুর, রাতের ওষুধ ভুলে যাওয়া সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
  • প্রেসক্রিপশনের একটি ছবি তুলে রাখুন।
  • কোর্স চলাকালে মোবাইলে একটি নোট বা ক্যালেন্ডারে টিক চিহ্ন দিন।
  • বাচ্চাদের সিরাপ হলে ঝাঁকিয়ে এবং সঠিক মাপে দিন।
  • ওষুধ খরচ বেশি মনে হলে ডাক্তারকে সৎভাবে জানান। কম খরচের বিকল্প থাকতে পারে।

চিকিৎসকের পরামর্শ কখন জরুরি?

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে

এন্টিবায়োটিক খাওয়ার পর পেটব্যথা, বমি ভাব বা হালকা ডায়রিয়া অনেকের হয়। কিন্তু নিচের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন:

  • শরীরে চাকা চাকা র‍্যাশ, চুলকানি
  • ঠোঁট, মুখ বা গলা ফুলে যাওয়া
  • শ্বাসকষ্ট (এমন হলে জরুরি বিভাগে যান)
  • পানির মতো ঘন ঘন ও তীব্র ডায়রিয়া
  • তীব্র বমি, যার কারণে ওষুধ খাওয়াই সম্ভব হচ্ছে না

সুস্থ লাগলে ওষুধ বন্ধ করার আগে

কোর্সের মাঝপথে ভালো লাগলে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে ডাক্তারকে একটি ফোন বা মেসেজ করুন। জিজ্ঞেস করুন, “আমি এখন অনেকটা ভালো আছি, কোর্স কি এখনই শেষ করা যাবে?” কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারই আগে বন্ধ করার অনুমতি দিতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে পুরো কোর্স নিশ্চিত করতে বলবেন। এই সিদ্ধান্ত রোগের ধরন দেখে নেওয়া হয়।

আবার অসুস্থ হলে

কোর্স শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর আবার একই উপসর্গ ফিরে এলে ওষুধের বাকিটা নিজে খেয়ে নেবেন না। আগের প্রেসক্রিপশন সঙ্গে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান। প্রয়োজনে পরীক্ষার মাধ্যমে ঠিক করা হবে কোন ওষুধ কার্যকর।

রোগী ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

এন্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ না করলে কী হয়?

উত্তর: সংক্রমণের কিছু জীবাণু শরীরে থেকে যেতে পারে। ফলে রোগ ফিরে আসতে পারে, কখনও আরও জটিল হয়ে। ভবিষ্যতে সেই ওষুধ কম কার্যকর হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তবে কোর্সের সঠিক সময়কাল ডাক্তারের সিদ্ধান্ত। মাঝপথে বন্ধ করার আগে তাঁকে জিজ্ঞেস করুন।

ভালো লাগলে কি এন্টিবায়োটিক বন্ধ করা যায়?

উত্তর: নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়। অনেক গবেষক বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে ছোট কোর্সই যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু সেটি ডাক্তার রোগ অনুযায়ী ঠিক করবেন। ভালো লাগছে বলেই ওষুধ ছাড়া ঠিক নয়।

এন্টিবায়োটিক খেতে ভুলে গেলে কী করব?

উত্তর: নিজে দ্বিগুণ মাত্রা খাবেন না। ওষুধের প্যাকেট বা প্রেসক্রিপশন সঙ্গে নিয়ে ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টকে জিজ্ঞেস করুন। ওষুধভেদে নিয়ম আলাদা হতে পারে।

সর্দি-জ্বরে কি এন্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত?

উত্তর: বেশিরভাগ সর্দি-কাশি ও ভাইরাল জ্বর ভাইরাসের কারণে হয়। এন্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। তাই অপ্রয়োজনে খেলে উপকার হয় না, বরং ঝুঁকি বাড়ে।

কোর্স শেষে অবশিষ্ট ওষুধ রেখে দিলে ক্ষতি কী?

উত্তর: যদি ডাক্তার বলে থাকেন পুরো কোর্স শেষ করতে, তাহলে অবশিষ্ট ওষুধ থাকার কথা নয়। কিছু থেকে গেলে সেটি পরে নিজে বা অন্য কাউকে দেবেন না। এতে ভুল ওষুধ, ভুল মাত্রা ও ঝুঁকির সম্ভাবনা থাকে। ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের কাছে জিজ্ঞেস করে নিরাপদে ফেলার উপায় জেনে নিন।

কোর্স শেষ না করলে কি রেজিস্ট্যান্স হবেই?

উত্তর: না, “হবেই” বলা যায় না। রেজিস্ট্যান্স তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ব্যবহার, ভুল মাত্রা এবং বিনা প্রেসক্রিপশনে খাওয়ার। তবে অসম্পূর্ণ চিকিৎসার ফলে রোগ ফিরে আসা, জটিলতা বাড়া, বা পরের বার ওষুধ কাজ না করার ঝুঁকি সত্যিই থাকে। এজন্যই সব ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।

শিশুদের এন্টিবায়োটিক খাওয়ানোর সময় কী খেয়াল রাখব?

উত্তর: শিশুর ওজন ও বয়স অনুযায়ী ডাক্তার মাত্রা ঠিক করেন। নিজে মাত্রা বাড়ানো-কমানো করবেন না। সিরাপ হলে প্যাকেটের নির্দেশ অনুযায়ী ঝাঁকিয়ে মাপের চামচ বা কাপে দিন। মেয়াদ ও রাখার নিয়ম দেখুন।


শেষ কথা

ফ্লেমিং ১৯৪৫ সালে যে সতর্কবাণী দিয়েছিলেন, আজ তা আমাদের চোখের সামনে বাস্তব হয়েছে। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার কারণে মারা যাচ্ছেন। বাংলাদেশের মতো দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনা ও অসম্পূর্ণ কোর্সের প্রবণতা বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলছে।

মনে রাখার মতো কয়েকটি কথা:

  • উপসর্গ কমা মানে সব জীবাণু শেষ হওয়া নয়।
  • ডাক্তার যে কোর্স দিয়েছেন, সেটিই আপনার জন্য নির্ধারিত। নিজে কমাবেন না বা বাড়াবেন না।
  • মাঝপথে ভালো লাগলে ওষুধ বন্ধ করার আগে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন।
  • প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক নয়, অন্যের বা পুরনো ওষুধও নয়।
  • সর্দি-কাশি আর ভাইরাল জ্বরে এন্টিবায়োটিক চাইবেন না।

আপনার জন্য একটি ছোট আহ্বান

আজই আপনার ঘরের ওষুধের বাক্সটা একবার দেখুন। অবশিষ্ট এন্টিবায়োটিক থাকলে সেগুলো নিজে খাবেন না, কাউকে দেবেন না। আর এই লেখাটি পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন। আপনার একটি ছোট সচেতনতা আরেকজনের জীবন বাঁচাতে পারে।


🩺 চিকিৎসাগত সতর্কবার্তা:

এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আর্টিকেল ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যসমূহ কেবল সাধারণ সচেতনতা এবং শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। এটি কোনো অবস্থাতেই পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। শারীরিক বা মানসিক যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য সবসময় একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এই ওয়েবসাইটের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়ভার সম্পূর্ণ ব্যবহারকারীর।

তথ্যসূত্র (References)

  1. IHME (Institute for Health Metrics and Evaluation): Antimicrobial Resistance (AMR), ২০২১ সালের মৃত্যু ও ২০২৫-২০৫০ সালের প্রক্ষেপণ।
    https://www.healthdata.org/antimicrobial-resistance/infographics
  2. HealthDay: In 2021, More Than 1 Million Deaths Attributed to Antimicrobial Resistance (GBD 2021 AMR Collaborators, The Lancet, ২০২৪ সালের গবেষণার সারসংক্ষেপ)।
    https://www.healthday.com/healthpro-news/infectious-disease/in-2021-more-than-1-million-deaths-attributed-to-antimicrobial-resistance
  3. WHO (World Health Assembly ৭৮): Antimicrobial resistance, ২০২১ সালের ৪.৭১ মিলিয়ন ও ১.১৪ মিলিয়ন মৃত্যুর তথ্য।
    https://apps.who.int/gb/ebwha/pdf_files/WHA78/A78_8-en.pdf
  4. NIHR Oxford Biomedical Research Centre: What can be done about the rising risk of antibiotic resistance? (ফ্লেমিংয়ের নোবেল বক্তৃতার সতর্কবাণী)।
    https://oxfordbrc.nihr.ac.uk/what-can-be-done-about-the-rising-risk-of-antibiotic-resistance/
  5. The National Archives (UK): Death of Sir Alexander Fleming, discoverer of penicillin.
    https://blog.nationalarchives.gov.uk/death-sir-alexander-fleming-discover-penicillin-11th-march-1955/
  6. REACT Group: The discovery of antibiotics (১৯৪১ সালের রোগীর ঘটনা ও ১৯৪৭ সালে প্রথম পেনিসিলিন রেজিস্ট্যান্স)।
    https://reactgroup.org/antibiotic-resistance/course-antibiotic-resistance-the-silent-tsunami/part-1/the-discovery-of-antibiotics
  7. Llewelyn MJ et al. The antibiotic course has had its day. BMJ 2017;358:j3418.
    https://doi.org/10.1136/bmj.j3418 (খোলা সংস্করণ: https://discovery.ucl.ac.uk/id/eprint/1567708/)
  8. University of Oxford, Nuffield Department of Primary Care Health Sciences: Has the antibiotic course had its day?
    https://www.phc.ox.ac.uk/news/has-the-antibiotic-course-had-its-day
  9. One Health Trust: প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনামূলক পর্যালোচনা, ২২ আগস্ট ২০১৭।
    https://onehealthtrust.org/?p=6838
  10. Journal of Pharmaceutical Policy and Practice (২০২১): বাংলাদেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিতরণ নিয়ে গুণগত গবেষণা।
    https://link.springer.com/doi/10.1186/s40545-021-00342-7
  11. The Financial Express (বাংলাদেশ): Use of antibiotics up in country, so is resistance (২০১৯)।
    https://thefinancialexpress.com.bd/health/use-of-antibiotics-up-in-country-so-is-resistance-1574914633
  12. The Financial Express (বাংলাদেশ): New research on antimicrobial resistance in Bangladesh paints a bleak picture (২০২২)।
    https://thefinancialexpress.com.bd/health/new-research-on-antimicrobial-resistance-in-bangladesh-paints-a-bleak-picture-1653300208

Similar Posts